রাজধানীর একটি হোটেলে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) বাংলাদেশ আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিন রফতানিকারক এমন অভিমত দেন। তারা হলেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী, উর্মি গ্রুপের পরিচালক ও সিইও আসিফ আশরাফ এবং উলকাসেমির সিইও ও প্রেসিডেন্ট এনায়েতুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মো. মাহবুব উর রহমান। এ সময় দেশের রফতানি খাতে অবদানের স্বীকৃতি দিতে দশমবারের মতো চারটি ক্যাটাগরিতে ‘এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস–২০২৬’ শীর্ষক সম্মাননা দেয়ার ঘোষণা দেয় বহুজাতিক ব্যাংকটি।
অনুষ্ঠানের থিমেটিক সেশনে অংশ নিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অনেক সময় খুব বেশি বিনয়ী বা গুটিয়ে থাকি, যার ফলে আমাদের পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে যথাযথভাবে প্রচার ও পরিচিতি পায় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের অবকাঠামো মাঝে মাঝে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হলো মানুষ। আমাদের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী, মেধা সম্পন্ন এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা মনোভাবাপন্ন। ব্যবসা করার জন্য মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ যদি ইতিবাচক চিন্তা করতে শুরু করে, তবে বাংলাদেশে কাজের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’
এ মুহূর্তে জ্বালানি সংকট ও দুর্বল অবকাঠামোই রফতানি প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা বলে দাবি করেন উর্মি গ্রুপের পরিচালক ও সিইও আসিফ আশরাফ। তিনি বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে যেকোনো খাতের রফতানি আদেশ পাওয়া কোনো সমস্যাই হবে না।’
আসিফ আশরাফ আরো বলেন, ‘নিজস্ব তুলা বা পলিমারের মতো মৌলিক কাঁচামাল না থাকা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছি। গত ৩০-৪০ বছরে আমরা উদ্যোক্তাদের মনোভাব, কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক এবং সহায়ক সেবার ওপর ভর করে এ বিশ্বমানের ইকোসিস্টেম তৈরি করেছি।’ প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তরুণদের প্রশিক্ষিত করা এবং তৈরি পণ্যের মান উন্নত করাই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উলকাসেমির সিইও ও প্রেসিডেন্ট এনায়েতুর রহমান বলেন, ‘সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তারা যথেষ্ট মেধাবীও। তাদেরকে সঠিকভাবে দক্ষ করে কাজে লাগানো গেলে দেশেই সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাংলাদেশে আসা উচিত ছিল।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অর্জন, বিশেষ করে হাই-টেক বা উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে। কারণ আন্তর্জাতিক গ্রাহকরা প্রায়ই ডেটা সিকিউরিটি এবং আমাদের দুর্বল ইন্টারনেট অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা এখনো একটি বড় সমস্যা। কারণ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের কাজে মাত্র ১ মিলি-সেকেন্ডের জন্য বিদ্যুৎবিভ্রাট হলে টানা কয়েকদিন ধরে চলা সার্ভার প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ করে দেয় এবং সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়।’
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, যেকোনো যোগ্য স্থানীয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডসের জন্য আবেদন করতে পারবে। এজন্য কোনো মাশুল নেই। এছাড়া অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে এইচএসবিসির গ্রাহক হওয়ারও প্রয়োজন নেই। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ২০ সেপ্টেম্বর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের কারিগরি সহযোগিতায় এ পুরস্কার দেয়া হবে।
আয়োজকরা জানান, আরএমজি ক্যাটাগরিতে বার্ষিক রফতানি আয় ১০ কোটি ডলার বা তার বেশি—এমন প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের অ্যাপারেল পণ্য বিবেচনায় নেয়া হবে। আর আরএমজি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ক্যাটাগরিতে অংশ নিতে হলে বার্ষিক রফতানি আয় হতে হবে ৫ কোটি ডলার বা এর বেশি। এ ক্যাটাগরিতে তৈরি পোশাক শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে সহায়তা করে—এমন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে অসনাতন বা নতুন ও উদীয়মান ক্ষেত্রের ম্যানুফ্যাকচারিং ক্যাটাগরিতে বার্ষিক রফতানি আয় ১ কোটি ডলার বা তার বেশি—এমন প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে। ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক, ফার্নিচার, জুতা, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, অটোমোটিভ কম্পোনেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য এ ক্যাটাগরির আওতায় আছে। এছাড়া সেবা খাতে বার্ষিক রফতানি আয় ৫০ লাখ ডলার বা তার বেশি—এমন প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে পেশাদারি, ডিজিটাল ও জ্ঞানভিত্তিক সেবা বিবেচনা করা হবে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড অব কমিউনিকেশনস তালুকদার নোমান আনোয়ার এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডসে অংশগ্রহণের নিয়মাবলি তুলে ধরেন। এ সময় সম্মাননা প্রসঙ্গে এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘বিগত নয়টি সংস্করণে আমরা ৪০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দিয়েছি। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানই পোশাক ও টেক্সটাইল-বহির্ভূত খাতের। এর অর্থ হলো পোশাক ছাড়াও অন্যান্য খাতে আমাদের রফতানি সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের অর্জিত অসাধারণ সাফল্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জন্যই এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের এ আয়োজন।’
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর অব ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট সাইয়াব আহমেদ এবং আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং বাংলাদেশের অংশীদার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইকরামুল্লাহ প্রমুখ।